
ইসলাম শ্রেফ একটি ধর্ম নয়, এটি একটি অনির্বাণ চেতনাও। যদি কুরআন মতে বলি – তবে পৃথিবীর সূচনা থেকেই ইসলাম আছে এবং থাকবে। কারও রক্তচক্ষু ইসলামকে অনবদমিত করতে পারেনি, পারবেও না কস্মিনকালে। মাঝখানে কখনওসখনও পৌরোহিত্যবাদ বা মোল্লাতন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে পৃথিবীকে বিভ্রান্ত ও সভ্যতাকে বিব্রত করতে চেয়েছে। কিন্তু দিনশেষে সেই পৌরোহিত্যবাদীরাই প্রমাদ গুনেছে পতিত হয়ে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় – মোল্লাতন্ত্রের পতন অনিবার্য।
যে যুগ বা যে সভ্যতাকে ইসলামের আতুড়ঘর ভাবা হচ্ছে সেটা আসলে সূচনা নয়, সেটা বৈপ্লবিক প্রত্যাবর্তন। হ্যাঁ, ৬১০ খৃস্টাব্দে ইসলাম তার বৈপ্লবিক অবস্থায় পরিগ্রহ করেছে আরবের সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক দরিদ্র যুবকের মাধ্যমে। সেই যুবকটি ছিলেন আলোকময়। তাঁর সেই আলোকস্ফটিক ছটায় সেই সভ্যতার পৌরোহিত্যবাদী কুরাইশদের ঘুম নষ্ট হয়েছিলো। সেদিন তারাই সে আলোকময় যুবকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলো, যারা ছিলো মসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণকারী সেবায়েত।
ইসলামিক তাহজিব তামাদ্দুনিক সংস্কারের কেন্দ্রই ছিলো মসজিদুল হারাম বা ক্বাবা ঘর। গোটা পৃথিবীর একত্ববাদী মানুষ প্রতিবছর সেই মহিমান্বিত ঘরকে তওয়াফ করতে যেতো। তাই সেই বহুজাতিক মিলনকে উপলক্ষ্য করে আরবের ফড়িয়া সমাজপতিরা নিজেদের সম্মানিত সেবায়েত ঘোষণা করেছিলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো নিছক ব্যবসায়িক। তারা তাদের ব্যবসাকে আরও আড়ম্বরপূর্ণ করার জন্য সেই ক্বাবাঘরে বিভিন্ন মূর্তির প্রতিস্থাপন করলো। মূর্তিগুলো মূলতঃ কাদের ছিলো?
ইতিহাস কয়েকটি নাম চাউর করেছে। লাত্, মানাত্, ওজ্জাত ইত্যাদি নামের মূর্তি স্থাপিত হয়েছিলো ক্বাবায়। কিন্তু সেই নামগুলো আসলে কাদের? সেই নামগুলো ছিলো ঈসায়ী মতাদর্শের কতিপয় বুজর্গদের। লাত্ মানাত্ প্রমুখরা নিঃসন্দেহে ভালো মানুষ ছিলেন, ধার্মিক ছিলেন। তাঁদের জীবদ্দশায় এমন কিছু কীর্তি ছিলো যেগুলো তাঁদেরকে সাধারণ মানুষের চাইতে উপরে নিয়ে গিয়েছিলো। তাঁদের মৃত্যুর বহুবছর পরে, আরবের কুরাইশ বংশীয় পৌরোহিত্যবাদীরা তাঁদের সম্মানার্থে তাঁদের প্রতিমূর্তি গড়ে তুললো। এই অপকর্মের পেছনে ওদের মহৎ কোনো উদ্দেশ্য ছিলো না, ছিলো সংশ্লিষ্ট বংশধরদের অনুরাগ আকর্ষণের অসদুদ্দেশ্য। একেকটি মূর্তিকে তারা একেকটি কাজের জন্য বিশেষায়িত করলো। কোনওটিকে বানালো বৃষ্টির দেবতা, কোনওটিকে ক্ষমতার।
আলোকময় যুবক মুহম্মদ বিন আব্দুল্লাহ্ তাদের সেই ফড়িয়াবাজি বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি এইসকল কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুবকদের সংঘবদ্ধ করছিলেন। এক সময় তিনি ধ্যানপ্রবণ হয়ে ওঠলেন। সেই ধ্যানের একাগ্রতার প্রয়োজনে তিনি পাহাড়ের নির্জনতাকে বেছে নিলেন। নিয়ম করে চলে যেতে লাগলেন হেরা পর্বতের একটি গুহায়। ২৮ বছর বয়স থেকেই তিনি নিয়মিত ধ্যানরত থাকতেন। প্রায় বারো বছর অতিবাহিত হওয়ার সময় তিনি আদিগন্ত বিস্তৃত এক জ্যোতির্ময় সত্ত্বার দেখা পেলেন। সেই সত্ত্বা তাঁকে মহান আল্লাহ্’র একজন দূত বলে পরিচয় দিলেন। এবং বললেন -“আপনি সেই পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার রসূল বা বাণীবাহক।”
গুহাফেরত মুহম্মদ ভাবান্তরিত হলেন। এতোদিনকার ভাবনায় তিনি কুরাইশদের পৌরোহিত্যবাদের যে অসারতা খুঁজে পেয়েছিলেন, মহান আল্লাহ্’র দূতের সাক্ষাৎ পেয়ে তিনি আরও প্রবলভাবে আত্মবিশ্বাসী হয়ে গেলেন। আল্লাহ্’র দূত তাঁর কাছে নিয়মিত আসতে শুরু করলেন। তাঁকে সেই সত্যপ্রচারের প্রেরণা জোগানো হলো। আত্মপ্রত্যয়ী মুহম্মদ নিজেকে রসূলুল্লাহ্ হিসেবে ঘোষণা করলেন। পৌরোহিত্যবাদী কুরাইশরা তাঁকে মেনে নিতে পারলো না, কারণ মুহম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মেনে নিলে তাদের ধর্মবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। আর সেই বাণিজ্যরক্ষার স্বার্থে আরবের ধর্মবণিকরা আল্লাহ্’র রসূলকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও যুবসমাজকে বিপথগামী করা মুরতাদ হিসেবে ঘোষণা করলো।
শুনতে অবাক লাগলেও এ কথাই সত্য যে – আরবের পৌরোহিত্যবাদী ধর্মবণিকরা আল্লাহ্’র রসূলকে ধর্ম অবমাননাকারী মুরতাদ -ই ঘোষণা করেছিলো। তিনি নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছিলেন। তাঁর সাথে আপোষ করার শতরকমের চেষ্টা করেছিলো ধর্মজীবীরা, কিন্তু তিনি সত্যের প্রশ্নে কাউকে একবিন্দুও ছাড় দিলেন না। তিনি সমাজবিপ্লবের কঠিন পথটাই বেছে নিলেন।
বিপ্লবীদের চলার পথ কোনওকালেই মসৃণ ছিলো না। তাঁর বেলায় সেই পথটা আরও কঠিনতর হলো। তিনি স্বগোত্রীয়দের নিপীড়নের শিকার হলেন। আপন পিতৃব্যরা তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করলো। একসময় তিনি দেশত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। সত্তর আশি জনের একটি কাফেলাকে কয়েক প্লাটুনে ভাগ করে পাঠিয়ে দিলেন মাতামহের দেশ ইয়াসরেবে। সর্বশেষ তিনি গেলেন তাঁর একজন মাত্র সাথীকে সঙ্গে নিয়ে।
ইতিহাস এই মহাবিপ্লবের সূচনাকে হিজরত নামে আখ্যায়িত করেছে। সেখান থেকে হিজরি সনও গণনা শুরু হলো। মহাবিপ্লবের সেই মহাযাত্রায় দ্বন্দ্ব বিক্ষুব্ধ ইয়াসরেবকে তিনি শান্তির ঠিকানায় পরিণত করলেন। গঠিত হলো পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধানের নগর রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে তিনি পৃথিবীর কাছে সাম্য ও শান্তির বার্তা পাঠাতে শুরু। সব দেশের ধর্মীয় পুরোহিতরাই তাঁর বিরোধিতা করলো। কিন্তু শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন মহামানব।
মহাবিপ্লবের মহাযাত্রায় মহামানব মুহম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সভ্যতার এক চূড়ান্ত স্বাক্ষর রাখলেন। একত্ববাদী ইসলামের বিধানকে সম্বল করে তিনি একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র গঠন করে ফেললেন। তিনিই প্রথম ঘোষণা করলেন তাঁর সংবিধানে যে মানুষের ধর্ম আছে কিন্তু রাষ্ট্রের কোনও ধর্ম নেই। মদিনায় বসবাসরত সকল নাগরিক যার যার ধর্ম পালনের স্বাধীনতা লাভ করলো সাংবিধানিকভাবেই।
ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্বলিত সাংবিধানিক রাষ্ট্র মদিনা সর্বশেষ অভিযান পরিচালনা করলো মক্কার পৌরোহিত্যবাদের বিপক্ষে। দশ হাজার মানুষের একটি বিশাল কাফেলা নিয়ে তিনি মক্কায় প্রবেশ করলেন হিজরতের আট বছর পর। নিজ জন্মভূমিতে সদলবলে ফিরে তিনি আরও একটি অনন্য মানবিকতার স্বাক্ষর রাখলেন। তিনি কোনও বিরুদ্ধবাদীর উপর চড়াও হলেন না, কেবল ক্বাবাঘরে স্থাপিত পৌরোহিত্যবাদকে গুঁড়িয়ে দিয়ে ক্বাবাকে উন্মুক্ত করে দিলেন সকল মানুষের জন্য।
ইতিহাস যেটাকে বলছে মক্কা বিজয়, সেটা মূলতঃ মোল্লাতন্ত্রের পতনের সূচনা। পবিত্র মক্কার সেদিনের সেই পৌরোহিত্যবাদ বারবার ফিরে এসেছে মোল্লাতন্ত্রের আদলে। মক্কায় যেভাবে পতন হয়েছিলো, সেই পতনের অনিবার্যতায় বারবার মাথাচাড়া দেয় মোল্লাতন্ত্র। আরবের পৌরোহিত্যবাদী ধর্মবণিকরা যেমন তাদের কল্পিত ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করায় রুষ্ট হয়েছিলো আল্লাহ্’র রসূলের উপর, তেমনি এখনও মোল্লাতান্ত্রিক ধর্মজীবীরা মোল্লাতন্ত্রকেই ইসলাম নামে চালিয়ে দিতে চায় পৃথিবীর দেশে দেশে।
ইসলামের বিজয় অবশ্যম্ভাবী, তেমনই মোল্লাতন্ত্রের পতনটাও অনিবার্য। যুগে যুগে পতিত হয়েছে পৌরোহিত্যবাদ মোল্লাবাদ ও মোল্লাতন্ত্র, আর বিজয়ের শেষ হাসিটা চিরকাল ইসলাম -ই হেসেছে। হাসবেও।
Discussion about this post