
লটকন স্বাদে-গন্ধে হচ্ছে মিষ্টি এবং আকৃতিতেও হচ্ছে বড় । নরসিংদীর অন্যান্য উপজেলার মতো মনোহরদী উপজেলায় ও বর্তমানে লটকন বিক্রি করে অর্থনৈতিক সাফল্য ফিরিয়ে আনছেন অনেকে।
তোতা মিয়া অর্জুনচর গ্রামের বাসিন্দা, নরসিংদীর মনোহরদীতে পরিত্যক্ত জমিতে লটকন চাষ করে ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন তোফাজ্জল হোসেন তোতা মিয়া।
২০০৬ সালে প্রায় তিন বিঘা জমিতে ১৬০ টি গাছ রোপণ করেন। চার বছর পর হতেই গাছে ফল আশা শুরু করে। প্রথম বছর মাত্র ছয় হাজার টাকা বিক্রি করলেও দ্বিতীয় বছর ৩৫ হাজার, তৃতীয় বছর ৭০ হাজার টাকা বিক্রি করেছেন। এরপর থেকে প্রতিবছর তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা বিক্রি করে আসছেন।
তিনি জানান, চলতি বছর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে চার লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়েছে। বাগানে প্রতি বছর পরিচর্যা বাবদ খরচ হয় মাত্র ১৫-২০ হাজার টাকা। আমার এ কাজে সহযোগীতা করছেন স্ত্রী এবং সন্তানরা। বাগানের লটকন সুস্বাধু হওয়ায় বিক্রি নিয়ে চিন্তা করতে হয় না।
বিভিন্ন এলাকার পাইকারি বিক্রেতারা প্রত্যেক বছর মাঘ এবং ফাল্গুন মাসে গাছে ফলন আসার পরই যোগাযোগ করতে শুরু করেন। পাইকারেরা বাগান থেকে প্রতি মণ লটকন দু-হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা দরে কিনে নেন। ফলে বেঁচে যায় পরিবহন খরচ। এখানকার উৎপাদিত শত শত মণ লটকন চাহিদা মেটাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার।
এই বাগানের আয় থেকে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি বাড়ি করেছি। সাংসরিক খরচসহ নাতি-নাতনিদের পড়াশোনার খরচও চালানো হয় লটকন বাগানের আয় থেকে।
অন্যান্য লটকন চাষিরা জানান, মনোহরদী উপজেলায় লটকনের বাগান রয়েছে ১০টি। কয়েক বছর আগেও লটকনের স্বতন্ত্র বাগান ছিল না। তখন অন্যান্য ফল গাছের সঙ্গেই দু-একটি লটকনের গাছ লাগানো হতো পরিবারে খাবারের জন্য। আগে লটকনের তেমন চাহিদা ছিল না, দামও ছিল কম, সে কারণে কেউ লটকনের স্বতন্ত্র বাগান করার চিন্তা করতো না। বর্তমানে চাহিদা মূল্য দুটোই বেড়েছে। অন্যান্য ফলের চেয়ে লটকনের ফলন অনেক বেশি হয় বলে কৃষকেরাও অধিক লাভবান হচ্ছেন। গাছের পুষ্টির সুষমতা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গাছের গোড়া থেকে প্রধান কাণ্ড গুলোতে থোকায় থোকায় এত বেশি ফল ধরে যে, তখন গাছের কাণ্ড বা ডালই দেখা যায় না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী খোকন মিয়া জানান, প্রতি কেজি লটকন ঢাকায় নিয়ে ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করা যায়।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানান, লটকন উচ্চ সমতল সব ধরনের জমিতেই জন্মে। এক সময়ের পরত্যক্ত ভূমি ও ছায়াযুক্ত ভূমি যা চাষাবাদের অযোগ্য সেখানে এখন লটকন চাষ করে তার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে। আগে গ্রামে-গ্রামান্তরের কোনো কোনো বাড়িতে কদাচিৎ লটকন গাছ দেখা যেত। চাহিদা তেমন ছিল না বলে কেউ এটিকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের কথা চিন্তা করতো না। মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে প্রচুর ক্যালোরি, খাদ্য ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এ ফলের চাহিদা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে ফলের মূল্যও। মাটি ও জাতগুণে লটকনের মধ্যে টক ও মিষ্টি দুই প্রকারেই পাওয়া যায়।
মনোহরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আয়েশা আক্তার জানান, বর্তমানে মনোহরদী উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে ১০টি বাগানে প্রায় ১৫ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হচ্ছে। দিন দিন এলাকার কৃষকদের মাঝে লটকন চাষের চাহিদা বাড়ছে। উপজেলা কৃষি অফিষ থেকে প্রতি বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের আদর্শ ফলবাগান প্রকল্পের আওতায় ফলবাগান করতে লটকন বাগানের প্রদর্শনী দেওয়া হয়। বাগানে চারা ও সার কৃষি অফিস থেকে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।
Discussion about this post